ভিটামিন B12 এর অভাবে কোন রোগ হয়, লক্ষণ, কারণ ও সমাধান

ভিটামিন B12 আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। এটি রক্ত তৈরি, স্নায়ুর সুরক্ষা এবং মস্তিষ্কের সঠিক কার্যকারিতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কিন্তু সমস্যা হলো, B12 এর ঘাটতি হলে শরীর একদিনে ভেঙে পড়ে না। ধীরে ধীরে বিভিন্ন অদ্ভুত উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে, যা অনেক সময় অন্য রোগ ভেবে ভুল করা হয়। ফলে চিকিৎসা দেরি হয় এবং জটিলতা বাড়ে।

এই লেখায় আমরা জানব ভিটামিন B12 এর অভাবে কোন কোন রোগ হয়, কী লক্ষণ দেখা যায়, কারা বেশি ঝুঁকিতে এবং কীভাবে এই ঘাটতি পূরণ করা যায়।

ভিটামিন B12 এর কাজ কী

ভিটামিন B12 শরীরে তিনটি বড় কাজ করে

১. লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করতে সাহায্য করে
২. স্নায়ুর সুরক্ষা আবরণ (মাইলিন) ঠিক রাখতে সাহায্য করে
৩. ডিএনএ তৈরিতে ভূমিকা রাখে

এই কাজগুলোর কোনো একটি ব্যাহত হলেই শরীরে বড় সমস্যা শুরু হতে পারে।

ভিটামিন B12 এর অভাবে যে প্রধান রোগগুলো হয়

মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া

এটি B12 ঘাটতির সবচেয়ে পরিচিত রোগ। এই অবস্থায় শরীর ঠিকমতো সুস্থ রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। রক্তকণিকাগুলো আকারে বড় হয় কিন্তু কাজ করতে পারে না।

লক্ষণ

  • সব সময় দুর্বল লাগা
  • হাঁটলেই হাঁপ ধরা
  • মাথা ঘোরা
  • ফ্যাকাশে ত্বক
  • হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া

এই অবস্থায় শরীরে অক্সিজেন ঠিকমতো পৌঁছায় না, তাই সব কাজেই ক্লান্তি লাগে।

স্নায়ুর ক্ষতি বা নিউরোপ্যাথি

B12 স্নায়ুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন অভাব থাকলে স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।

লক্ষণ

  • হাত পায়ে ঝিনঝিনি
  • অবশ বা পিন ফোটার মতো অনুভূতি
  • পা ভারী লাগা
  • হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য হারানো
  • জিনিস ধরে রাখতে সমস্যা

গুরুতর ক্ষেত্রে স্নায়ুর ক্ষতি স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।

মস্তিষ্ক ও মানসিক সমস্যা

অনেকে জানেন না যে B12 এর অভাব মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে।

লক্ষণ

  • স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
  • মনোযোগের অভাব
  • বিভ্রান্তি
  • মুড পরিবর্তন
  • ডিপ্রেশনের মতো উপসর্গ

বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি ডিমেনশিয়ার মতো মনে হতে পারে।

জিহ্বা ও মুখের সমস্যা

B12 কমে গেলে মুখের ভেতরেও সমস্যা হয়।

  • জিহ্বা লাল ও মসৃণ হয়ে যাওয়া
  • জিহ্বায় জ্বালা
  • মুখে ঘা
  • খাবারের স্বাদ কমে যাওয়া

দৃষ্টিশক্তির সমস্যা

দুর্লভ হলেও অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হলে চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা হতে পারে।

কেন B12 ঘাটতি এত বিপজ্জনক

B12 এর ঘাটতি ধীরে ধীরে বাড়ে। প্রথমে শুধু ক্লান্তি থাকে, মানুষ ভাবে কাজের চাপ বা ঘুম কম হয়েছে। এরপর ঝিনঝিনি শুরু হয়, তখন অনেকে নার্ভের আলাদা সমস্যা ভাবেন। কিন্তু যখন বুঝতে পারেন যে সমস্যা ভিটামিনের, তখন অনেক সময় স্নায়ুর ক্ষতি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। তাই অকারণে দীর্ঘদিন দুর্বলতা বা হাত পায়ে অদ্ভুত অনুভূতি থাকলে রক্ত পরীক্ষা করা খুবই জরুরি।

কারা বেশি ঝুঁকিতে

কিছু মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।

  • নিরামিষভোজী বা ভেগান
  • বয়স্ক মানুষ
  • যাদের পেট বা অন্ত্রের অপারেশন হয়েছে
  • দীর্ঘদিন গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাওয়া মানুষ
  • ডায়াবেটিসের ওষুধ মেটফরমিন ব্যবহারকারী
  • যাদের পেটের শোষণ সমস্যা আছে

কারণ B12 মূলত প্রাণিজ খাবারে পাওয়া যায় এবং শরীরে শোষণের জন্য সুস্থ পাকস্থলী দরকার।

কীভাবে পরীক্ষা করা হয়

ডাক্তার সাধারণত রক্ত পরীক্ষা দেন।

  • Serum Vitamin B12 Test
  • Complete Blood Count
  • প্রয়োজনে Homocysteine বা Methylmalonic Acid পরীক্ষা

রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক বোঝেন ঘাটতি কতটা গুরুতর।

চিকিৎসা কী

ঘাটতির মাত্রার ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে।

হালকা ঘাটতি

ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল

মাঝারি বা গুরুতর ঘাটতি

ইনজেকশন, কারণ শরীর দ্রুত শোষণ করতে পারে

অনেক সময় কয়েক মাস নিয়মিত চিকিৎসা দরকার হয়।

খাবারের মাধ্যমে B12 বাড়ানোর উপায়

প্রাকৃতিকভাবে B12 পাওয়া যায় এসব খাবারে

  • মাছ
  • মাংস
  • ডিম
  • দুধ
  • দই
  • পনির

নিরামিষভোজীদের জন্য ফোর্টিফায়েড সিরিয়াল বা সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে।

কখন অবশ্যই ডাক্তার দেখাবেন

  • দীর্ঘদিন দুর্বলতা
  • হাত পায়ে অবশ ভাব
  • স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
  • হাঁটতে ভারসাম্য সমস্যা
  • অজানা কারণে অ্যানিমিয়া

এগুলোকে হালকা সমস্যা ভেবে এড়িয়ে গেলে পরে বড় জটিলতা হতে পারে।

উপসংহার

ভিটামিন B12 এর অভাব শুধু একটি সাধারণ পুষ্টির ঘাটতি নয়, এটি রক্ত, স্নায়ু এবং মস্তিষ্কের গুরুতর রোগের কারণ হতে পারে। ভালো খবর হলো, সময়মতো ধরা পড়লে এই সমস্যা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাই শরীরের অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঝিনঝিনি বা স্মৃতির সমস্যা অবহেলা না করে পরীক্ষা করান। সচেতনতা ও সঠিক পুষ্টিই সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি।

Follow us on Social Media